Thursday, February 27, 2020

ঋণখেলাপির সম্পত্তি দখল নিতে পারবে সরকার




সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে। বর্তমানে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে আছে। এই টাকা আদায়ে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু কোনো পদক্ষেপেই এই বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায় করা যাচ্ছে না। যে কারণে খেলাপি ঋণ আদায়ে প্রথমবারের মতো আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন, ২০২০’ নামে ইতোমধ্যে নতুন এই আইনের একটি খসড়া প্রণয়ন করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।
সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হলে নতুন প্রণীত এই আইনের খসড়া অনুযায়ী ‘অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন’ গঠন করে খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যবস্থা নিতে পারবে। সরকারি বিশেষায়িত এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি আদায়ে সম্ভব সব ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজন মনে করলে ঋণখেলাপির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বিক্রি করে দিতে পারবে। পারবে লিজে দিতেও। ঋণখেলাপির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল, পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন এবং ঋণ পুনর্গঠনও করতে পারবে। খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর এই প্রথম কোনো বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানকে এত ক্ষমতা দিয়ে নতুন আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, অন্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, ‘ননপারফরমিং’ ঋণ আদায় ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এই আইন প্রাধান্য পাবে। খবর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রের।
খেলাপি ঋণ কমিয়ে এনে আদায় বাড়ানোর জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন ২০২০’-এর খসড়া প্রণয়নের পর এখন সর্বসাধারণের মতামত নেওয়ার জন্য তা প্রকাশ করেছে।
এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল আমাদের সময়কে বলেন, এ ধরনের আইন প্রয়োজন আছে। তবে সেখানে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেওয়া দরকার।
তিনি আরও বলেন, তবে সার্বিকভাবে খেলাপিদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার। সরকার এর মাধ্যমে উদ্যোগ নিচ্ছে এটি ভালো। তবে এর আগে রাজনৈতিক কারণে ঋণ দেওয়া-নেওয়া বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি আইন পাসের আগে অন্যান্য দেশে এ ধরনের আইনে কী বলা আছে তা দেখা উচিত বলে পরামর্শ তার।


নতুন এ আইনে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে খসড়ায় বলা হয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ননপারফরমিং ঋণ আদায় ও ব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ গ্রহীতা হওয়ার প্রবণতা কমানো, বিনিয়োগের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ, নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও উৎসাহ প্রদান এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে সহায়তা ও পরামর্শ প্রদানের জন্যই এ আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে।
আইনটিতে পুঁজিবাজার স্থিতিশীল রাখতে করপোরেশনকে শেয়ার, বন্ড ও ডিবেঞ্চার বা মিউচ্যুয়াল ফান্ড কিনে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তহবিল সংগ্রহে সেখান থেকে অর্থও তুলতে পারবে করপোরেশন।
জানা গেছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করবে। প্রতিটি ব্যাংক পৃথক পৃথকভাবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করবে। চুক্তি অনুযায়ী, ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হলে সেগুলো করপোরেশনের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করবে। তার পর করপোরেশন সে খেলাপি ঋণ আদায়ে সোচ্চার হবে। এ ক্ষেত্রে করপোরেশন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি মোতাবেক আদায়কৃত খেলাপি ঋণের অংশ নেবে।
খসড়া আইনের ধারা ২৩-এ করপোরেশনের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গ্রহণসহ কর্তৃত্ব নিয়ে নিতে পারবে। ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির ব্যবসায়ের সম্পূর্ণ বা আংশিক বিক্রয় বা লিজ দিতে পারবে। বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি চাইলে ঋণগ্রহীতার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ কিংবা পুনর্গঠন করতে পারবে। কোনো প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি হলে করপোরেশনের এক বা একাধিক এজেন্ট প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে কাজ করবেন। আর যদি কোনো ব্যক্তি ঋণখেলাপি হয় তা হলে এজেন্ট প্রশাসকের ক্ষমতা পাবে। ঋণগ্রহীতার বকেয়া নিষ্পত্তি করার ক্ষমতাও দেওয়া হচ্ছে করপোরেশনকে। এ ছাড়া জামানতের দখল, সুরক্ষা, এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে লিজ বা বিক্রয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা পাচ্ছে সরকারি এ প্রতিষ্ঠান। ঋণগ্রহীতার ঋণের সম্পূর্ণ বা যে কোনো অংশ শেয়ারে রূপান্তর করতে পারবে। করপোরেশন নিজ নামে মামলা দায়ের করতে পারবে। শুধু দেশের নয়, বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি ঋণখেলাপি হলে সে ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা এবং মামলা করতে পারবে করপোরেশন। যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ করপোরেশন কিনবে সেগুলো আদায়ের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা করতে এবং মামলায় পক্ষ হতে পারবে। আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ক্ষমতা বা অধিকার করপোরেশন পাবে।
সরকার চাইলে করপোরেশন খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দিতে পারবে। তবে করপোরেশন প্রতিবছর একটি বার্ষিক প্রতিবেদন সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে দেবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য করপোরেশন কেন্দ্রীয় তথ্য ভাণ্ডার স্থাপন করবে। আর এর সঙ্গে ঋণের জামানত রেজিস্ট্রি প্ল্যাটফর্মের সমন্বয় করবে।
খসড়া আইনের ধারা ৭ এবং ৮-এর মধ্যে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনের শেয়ার মূলধন এবং পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের ব্যাপারে বলা হয়েছে। ধারা ৭ মোতাবেক করপোরেশনের অনুমোদিত শেয়ার মূলধন হবে ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিটি ১০ টাকা মূল্যের ৫০০ কোটি সাধারণ শেয়ারে বিভক্ত হবে। সরকার সময় সময় অনুমোদিত শেয়ার মূলধন বৃদ্ধি করবে। করপোরেশনের পরিশোধিত শেয়ার মূলধনের পরিমাণ হবে ৩ হাজার কোটি টাকা। সরকার চাইলে তা আরও বাড়াতে পারবে।
৮ ধারায় বলা হয়েছে, তহবিল সংগ্রহের জন্য করপোরেশন প্রয়োজনে পুঁজিবাজারে বন্ড ইস্যু করতে পারবে। পুঁজিবাজারের স্বার্থে তথা তহবিলের জন্য করপোরেশন বন্ড ও ডিবেঞ্চার, শেয়ার বা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করতে পারবে। একই সঙ্গে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লাভজনক যে কোনো খাতেও এটি বিনিয়োগ করতে পারবে। করপোরেশন তহবিল বা ফান্ড গঠন বা বাড়াতে এক বা একাধিক, দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগকারী কিংবা ফান্ড/ফান্ড ম্যানেজারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে পারবে। করপোরেশন চাইলে এক বা একাধিক সাবসিডিয়ারি কোম্পানিও গঠন করতে পারবে।
করপোরেশনের চেয়ারম্যান হবেন পদাধিকার বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব। এর পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদ হবে তিন বছর। এক-তৃতীয়াংশ সদস্য উপস্থিত হলেই এর কোরাম পূর্ণ হবে বলে আইনের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে।

আমাদের সময়

সুনীল অর্থনীতিই আগামীর নির্ভরতা

সাগর
প্রাণিবিজ্ঞানী মারাহ্ জে. হার্ডট ২০১৭ সালে ‘মনোরহ্যাফিশ শুনি’ প্রজাতির যে সামুদ্রিক স্পঞ্জটির কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেটির বয়স ১১ হাজার বছর। অর্থাৎ ১১ হাজার বছর ধরে প্রাণীটি সমুদ্রের তলদেশে বেঁচে আছে। তাহলে আমরা যে এতদিন জানতাম পৃথিবীর দীর্ঘজীবী প্রাণী হচ্ছে কচ্ছপ, সে ধারণাটি ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়েছে।
এর মাধ্যমে আমরা জানলাম, এ ধরনের বিস্ময়কর তথ্য আমরা একমাত্র সমুদ্র থেকেই পেতে পারি। এই যে দীর্ঘজীবী সামুদ্রিক প্রাণী সেগুলোর জিন মানবদেহে প্রবিষ্ট করানো সম্ভব হলে কি মানুষও এতটা দীর্ঘজীবী হবে? এটি বিজ্ঞানীরা ভেবে দেখতে পারেন।
তবে আমরা যে ধারণাটি পেলাম সেটি হচ্ছে, সমুদ্র যেমন অপার রহস্যের আধার, তেমনি শক্তিরও বিশাল উৎস। এ শক্তিশালী সমুদ্র এতদিন আমাদের ছিল না। ছিল না বলেই সমুদ্র সম্পর্কে আমাদের ধারণাও ছিল খুবই সীমিত। আমরা বলি, সমুদ্র স্নানে যাচ্ছি এবং অতঃপর হাঁটুপানিতে জলকেলি করে মধুচন্দ্রিমা সেরে ফেরত আসি।
২০১২ সালে আমাদের সামনে সমুদ্রের এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হল। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের নেতৃত্বে আমরা মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে বিবাদ মিটিয়ে সাকুল্যে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা লাভ করি।
তাতে আমাদের মোট সমুদ্রসীমার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার ১১০ বর্গকিলোমিটার, যা আগে ছিল ২ হাজার ২৯৭ বর্গকিলোমিটার। হিসাব করলে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশের প্রায় সমান, অর্থাৎ মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২৬ হাজার ৪৬০ বর্গকিলোমিটার ছোট।
তার মানে আমাদের তৃতীয় প্রতিবেশীটি বেশ বড়সড় শরীর নিয়ে আমাদের পাশে অবস্থান করছে। এখন তাকে আর অবহেলা করা যাবে না, এখন অবলোকন করার কার্যক্রম আর হাঁটুপানিতে স্নান করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
গভীর এ সমুদ্রকে এখন আমাদের গভীরভাবেই পর্যবেক্ষণ করতে হবে। জানার চেষ্টা করতে হবে কী অমূল্য সম্পদ লুকিয়ে আছে সমুদ্রজুড়ে এবং এর তলদেশে। অবশ্য অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই সমুদ্রের দিকে আমাদের ধাবিত হতে হবে।
চাষযোগ্য জমির পরিমাণ হ্রাস এবং অন্যান্য কারণে যেভাবে আমাদের খাদ্যভাণ্ডার সংকুচিত হয়ে আসছে তাতে বিকল্প খাদ্যের অনুসন্ধান করা ছাড়া উপায় নেই। এ অনুসন্ধানে সমুদ্রই অকৃপণ হস্তে তার ভাণ্ডারের দ্বার উন্মুক্ত করে দিতে পারে।
সংস্কারবশত আমরা যে এতদিন সি ফুড ব্যবহার করতাম না, সেই মানসিক অবস্থান থেকে এখন সরে আসতে হবে। ফিল্ড ওয়ার্কের একটি অভিজ্ঞতা না বললেই নয়। সি উইড (সামুদ্রিক শৈবাল) নামের ঔষধি গুণসম্পন্ন যে সমুদ্র সম্পদটি পরিচিত, সেটি কাঁচাই খাওয়ার যোগ্য। অতঃপর রন্ধন করে খেয়ে দেখেছি এর স্বাদের সীমাই নেই। তেমনি বিশ্বব্যাপী যে সি ফুড ব্যাপকভাবে প্রচলিত, সেগুলোর প্রতি আমাদের নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে।
আমরা যদি একটি হাইপোথিসিসের মাধ্যমে অগ্রসর হই যে, সমুদ্র প্রাণপ্রাচুর্য আর ঐশ্বর্যে ভরপুর তাহলে অনেক পেছনে ফিরে তাকাতে হবে, তাকাতে হবে পুরাণের যুগে। এ নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম যেমনটি বলেছিলেন, ‘মন্থন-মন্দার দিয়া দস্যু সুরাসুর/মথিয়া লুণ্ঠিয়া গেছে তব রত্নপুর।’ (সিন্ধু, তৃতীয় তরঙ্গ)।
তবে পুরাণের যুগ যেহেতু বাসি হয়েছে, আমাদের বাস্তবভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে জেনে নিতে হবে আমরা আসলে কতটা ঐশ্বর্যশালী। এ অবস্থায় সমুদ্র জয়ের প্রেক্ষাপটে বৈজ্ঞানিক (সিসমিক ও ভূতাত্ত্বিক) গবেষণাই হতে হবে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।
যে যত কথাই বলুক, এ জরিপ ও গবেষণা কর্মটি সম্পন্ন হয়নি বলেই সমুদ্র জয়ের ৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও আমরা এখনও কোনো সমুদ্র সম্পদ উত্তোলন করতে সক্ষম হইনি।
গভীর সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আমরা তো জানিই যে, ভারত মহাসাগরের অংশ বিধায় আমাদের বিজিত সমুদ্রসীমায় টুনা মাছের প্রাচুর্য আছে। তা আছে বটে; কিন্তু টুনা ধরা মোটেও সহজ নয়।
২০১৭ সালে নিউইয়র্কে সমুদ্র সম্মেলনে যোগদানের সময় এক মালদ্বীপ প্রতিনিধির মুখে পিলে চমকানো কথা শুনেছিলাম। ছোট্ট একটি দ্বীপ হলেও মালদ্বীপ প্রতিদিন ১০০ টন টুনা মাছ ধরছে।
কারণ তাদের প্রত্যেক পরিবারেই রয়েছে একটি করে মাছ ধরার নৌকা, সর্বোপরি তাদের রয়েছে এ পদ্ধতিতে মাছ ধরার হাজার বছরের ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশও সমুদ্রজয়ের পর এ বিষয়ে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে শুরু হবে লং লাইনার ও পার্স সেইনিং পদ্ধতিতে মাছ ধরার কার্যক্রম।
তেমনি জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেট্রোবাংলা শুরু করেছে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজ। রাখাইন বেসিনের তেল-গ্যাস অনুসন্ধান করে মিয়ানমার যদি তার সুনীল অর্থনীতির ফল ভোগ করতে পারে, তবে এর প্রতিবেশী বেঙ্গল বেসিন থেকে বাংলাদেশও সম্পদ আহরণ করে তার অর্থনীতিতে আয় যোগ করতে সক্ষম হবে।
ওদিকে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর অনুসন্ধান করছে খনিজসম্পদের। আমাদের সমুদ্রের তলদেশে জিরকন, রুটাইল, গারনেট, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট ইত্যাদি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এসব এখন সময়ের ব্যাপার, তবে লক্ষ রাখা উচিত সময় দ্রুত কমিয়ে আনার।
কারণ সুনীল অর্থনীতির উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ অতিরিক্ত কালক্ষেপণই করে ফেলেছে। ব্লু ইকোনমির আরও অনেক উদ্যোগ রয়েছে। সমুদ্রের বিশাল জলরাশিকে ব্যবহার করার জন্য বাংলাদেশ-ভারত-শ্রীলংকা-মালদ্বীপ- এ ৪টি দেশের সমন্বয়ে সিক্রুজ-কোস্টাল ট্যুরিজমের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
এতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন সমন্বিতভাবে কাজ করবে। আমরা জানি, ইতিমধ্যেই ঢাকা থেকে কলকাতা অভিমুখে যাত্রা সম্পন্ন করেছে সিক্রুজের প্রথম জাহাজটি।
‘সিন্ধু’ কবিতায় ছিল সমুদ্র মন্থনের কথা। আমরা যদি সম্পদ আহরণ করতে গিয়ে সমুদ্র মন্থন করে সব শেষ করে দিই তাহলে তো চলবে না। আশার কথা এ বিষয়ে অন্তত বাংলাদেশের সচেতনতার ঘাটতি দেখা দেয়নি।
২০১৭ সালের সমুদ্র সম্মেলনেই বাংলাদেশ এ বিষয়ে ৩টি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত অঙ্গীকার করেছিল : এক. ২০২৫ সালের মধ্যে সামুদ্রিক এলাকায় সব ধরনের দূষণ, বিশেষ করে মূল ভূভাগ থেকে দূষণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়ে আনা, দুই. ২০২০ সালের মধ্যে ৫ শতাংশ সামুদ্রিক এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে সংরক্ষণ করা, তিন. ২০২০ সালের মধ্যে সামুদ্রিক এলাকা থেকে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ, অবৈধ, অধিকৃত, নিয়ন্ত্রণাধীন এবং ধ্বংসাত্মক মৎস্য আহরণ পদ্ধতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
উল্লেখ্য, নিঝুম দ্বীপ এলাকায় সমুদ্র সংরক্ষণের উদ্যোগের মাধ্যমে এ কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৪-এর অধীনে।
আশানুরূপ ফলোদয় না হলেও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগ যথাযথ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়াদির সুষ্ঠু সমন্বয়ের জন্য জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অধীনে সরকার সৃষ্টি করেছে ব্লু ইকোনমি সেল।
উদ্যোগ ও বাস্তবায়নের মধ্যে কোনো গ্যাপ তৈরি না হলে গুন্টার পাউলির ভাষ্য অনুযায়ী, এ দেশও ১০ বছরে ১০০ উদ্ভাবন দ্বারা ১০০ মিলিয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বপ্ন দেখতে পারে। এতে প্রাইভেট সেক্টরের কার্যকর ভূমিকা থাকবে।
জাতীয় কবি কালজয়ী ‘সিন্ধু’ কবিতাটি লিখেছিলেন ৯৩ বছর (১৯২৬ সালের ৩১ জুলাই) আগে, চট্টগ্রাম বসে। এতে তিনি সাবমেরিনের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন : হাঙর-কুমির-তিমি চলে ‘সাবমেরিন’। তাহলে কত বছর পর আমাদের নৌবাহিনী সাবমেরিনের মালিকানা অর্জন করল?
তবে এ ধরনের সময় অতিক্রান্তিকে উদাহরণ হিসেবে ধরে না নিলেও এবং জাতীয় ক্ষতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত না করলেও এটি বলার অপেক্ষা রাখে না, সুনীল অর্থনীতির উদ্যোগ বাস্তবায়নে আমরা খানিকটা সময় নিয়েই ফেলেছি। এ ক্ষতি পোষানোর জন্য আমাদের একটি ইতিবাচক ‘গ্রেট লিপ ফরোয়ার্ড’ নীতি অবলম্বন করার কথা ভাবতে হবে।
ড. গোলাম শফিক : প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক

Friday, February 21, 2020

ঋণখেলাপিদের অর্থ কোথায় যায় হচ্ছে ব্যাংকিং কমিশন, অর্থনীতি সম্পৃক্ত দাপুটে কাউকে আনার চিন্তা, খেলাপি বন্ধে কঠোর সরকার

ঋণখেলাপিদের অর্থ কোথায় যায়
সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ঋণখেলাপিরা ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ কোথায় রেখেছেন বা কোন কাজে ব্যয় করেছেন তা অনুসন্ধান করছে সরকার। এদের মধ্যে যারা বিদেশে অর্থ পাঠিয়ে দিয়েছেন তাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যারা পাচার করা টাকায় বসবাস করছেন কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর তাদের বিষয়েও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ২২ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে ৮ হাজার ঋণখেলাপির তথ্যসংবলিত একটি তালিকা প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে গত বছরের জুনে সংসদে ৩০০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করা হয়। এদিকে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং কমিশন গঠন করা হচ্ছে। দাপুটে কোনো অর্থনীতিবিদকে এ কমিশনের প্রধান করা হতে পারে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হবে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনকে। অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক-সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, সঠিকভাবে অনুসন্ধান করা হলে শীর্ষ ঋণখেলাপির অধিকাংশই স্বেচ্ছা খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন। এর বেশির ভাগই ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়ে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পরিশোধ করেননি। অনেকে ঋণের টাকার প্রায় পুরোটাই কোনো না কোনোভাবে পাচার করে দিয়েছেন। কেউ কেউ আমদানি-রপ্তানির আড়ালে ওভার ইনভয়েস করে তা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করে দিয়েছেন। আর সে টাকায় সেকেন্ড হোম গড়েছেন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে। সেখানে তারা পাচার করা টাকায় বিলাসী-জীবন যাপন করছেন। সম্প্রতি শতাধিক ঋণখেলাপির বিষয়ে তদন্ত করে এমন প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। এদের তালিকা বাংলাদেশ ব্যাংককেও দেওয়া হয়েছে। কমিশন মনে করে, অনেকেই পাচারের উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ব্যাংকের সঙ্গে প্রতারণা করে ভুয়া নাম-ঠিকানা, নামসর্বস্ব কোম্পানির  সাইনবোর্ড, ভুয়া দলিল-দস্তাবেজ ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা মেরে দিয়েছেন। বছরের পর বছর তা আর পরিশোধ করেননি। বরং সে টাকা বিদেশে নিরাপদে পাচার করে দিয়েছেন। এসব ঋণখেলাপিকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার কথা ভাবছে সরকার। যারা ইতিমধ্যে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন তাদের ব্যাপারেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধবিষয়ক সংস্থাগুলোর কাছে সহায়তাও চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া খেলাপি ঋণ তুলতে সর্বময় ক্ষমতা দিয়ে কঠোর একটি নতুন আইন করা হচ্ছে। এ আইনে যেসব ব্যাংক খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হবে, তা আদায়ের ভার দেওয়া হবে সরকারের প্রস্তাবিত নতুন সংস্থা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনকে। সরকারের বিশেষায়িত এই আর্থিক প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ আদায়ে সম্ভব সব ধরনের ক্ষমতা পাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রয়োজন মনে করলে ঋণখেলাপির ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানও বিক্রি করে দিতে কিংবা লিজ দিতে পারবে। ঋণখেলাপির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি দখল, পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন, ঋণ পুনর্গঠনও করতে পারবে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে ‘বাংলাদেশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন, ২০২০’ নামে একটি আইনের খসড়াও ইতিমধ্যে চূড়ান্ত করেছে। অন্যদিকে ঋণখেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কট ও হেয় প্রতিপন্ন করতে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ২০০৯ সংশোধন করা হচ্ছে। এরা যাতে বিলাসবহুলভাবে বিদেশ ভ্রমণ না করতে পারে সেজন্য তাদের তালিকা পাঠানো হবে বিমান কর্তৃপক্ষের কাছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে এদের ট্রেড লাইসেন্স, গাড়ি ও বাড়ি রেজিস্ট্রেশন এবং ব্যবসা নিবন্ধনে। শুধু তাই নয়, খেলাপিদের যেসব পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং জেনারেল ম্যানেজার সুবিধা দেবেন তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। এ ধরনের কঠোর বিধান রেখে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ সংশোধন করছে সরকার। খসড়া আইনে, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের যাতে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয় সেজন্য রাখা হয়েছে বিশেষ বিধান। জানা গেছে, ঋণখেলাপি সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা সত্ত্বেও খেলাপি ঋণ কমছে না। দুই শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুবিধা খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণের সুযোগ দেওয়া হলেও খেলাপি ঋণ কমাতে তা তেমন কোনো কাজে আসেনি। এজন্য স্বভাবজাত ঋণখেলাপিদের ধরতে এ-সংক্রান্ত আইনগুলোয় কঠোর ধারা যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং কমিশন ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। ব্যাংক যেসব খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারবে না, সেগুলো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন আদায় করবে। এতে খেলাপি ঋণ অনেক কমে যাবে। এজন্য অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশনকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। আইনটি করতে মালয়েশিয়া, কোরিয়া, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের আইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ২০০২ সাল থেকে এই চার দেশ খেলাপি ঋণ আদায়ে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন দিয়ে সফল হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়সংক্রান্ত এখন পর্যন্ত নেওয়া উদ্যোগগুলো তেমন কোনো কাজে আসেনি। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট করপোরেশন করার কথা শোনা যাচ্ছে। এসব উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা নির্ভর করছে সরকার এগুলো কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে তার ওপর। কেননা কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা ছাড়া এ মুহূর্তে খেলাপি কমিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব।
এদিকে দেশের ব্যাংকগুলো ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায় করতে পারছে না। কিন্তু কাগজে-কলমে এবার খেলাপি ঋণের পরিমাণ কম দেখানো হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, তিন মাসের ব্যবধানে ২২ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ কমিয়ে ফেলেছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। আর ডিসেম্বরে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছ ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৯৪ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গছে, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ। আর সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তালিকা অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি গ্রাহক রয়েছে একাধিক গার্মেন্ট কোম্পানি। আছে চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানিও। এ দুটি খাতের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এরাই ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে মনে করে দুদক। সংসদে অর্থমন্ত্রীর প্রকাশিত ঋণখেলাপির তালিকায় বেশকিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এদিকে ব্যাংকের টাকা মেরে বিদেশে বিলাসী-জীবন যাপন করছেন এদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত পি কে হালদার, ইসা বাদশা ও মুসা বাদশা। এর বাইরে অন্তত ২০০ জনের একটি তালিকা নিয়ে কাজ করছে দুদক, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংক। যারা বিভিন্ন সময়ে ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করে দিয়েছেন। এদের অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।

Wednesday, February 19, 2020

বিনিয়োগে জাপানিদের পছন্দ বাংলাদেশ

জাগরণ চাকমা
এশিয়া ও ওশেনিয়া মহাদেশের মধ্যে বিনিয়োগের জন্য জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রথম পছন্দ বাংলাদেশ। কারণ, এখানে সম্ভাবনার পাশাপাশি মুনাফার পরিমাণ অনেক বেশি। এমনটিই দেখা যাচ্ছে জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেইটিআরও) এক সমীক্ষায়।
বাংলাদেশে কাজ করা জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে এদেশে ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। প্রায় ২৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান একই গতিতে তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসার পরিসর কমানোর কথা জানিয়েছে।
‘এশিয়া এবং ওশেনিয়া অঞ্চলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক অবস্থানের জেইটিআরও জরিপ ২০১৯’ থেকে এসব তথ্য পাওয়া যায়। তবে এই জরিপ প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও প্রকাশিত হয়নি।
এশিয়া ও ওশেনিয়ার ২০ দেশে ১৩ হাজার ৪৫৮টি জাপানি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার পরিকল্পনার ভিত্তিতে গত বছর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে এই জরিপটি করা হয়।
ভারতে কাজ করা বেশিরভাগ জাপানি প্রতিষ্ঠান সেখানে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী। সে দেশে কাজ করা ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যবসা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের পরেই জাপানিদের পছন্দ ভিয়েতনাম। সেখানে কাজ করা ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এরপরই রয়েছে পাকিস্তান। সেখানকার ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ জাপানি প্রতিষ্ঠান পাকিস্তানে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী।
জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক লাভের হিসাবে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশে পরিচালিত জাপানি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে মুনাফা বেশি হবে বলে আশা করছে। ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশের প্রত্যাশা ব্যবসা একই রকম থাকবে এবং প্রায় ১৮ দশমিক ৪  শতাংশ তাদের লাভ কমার আশঙ্কা করছে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ আগামী এক বছরে বাংলাদেশি কর্মী বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ একই রাখবে এবং ২ দশমিক ৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কমাতে চায়।
জরিপ করা দেশগুলোর মধ্যে স্থানীয়দের নিয়োগ করার পরিকল্পনার হারে বাংলাদেশ গত বছর পঞ্চম অবস্থানে থাকলেও এ বছর উঠে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে।
জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, “স্থানীয়ভাবে বাংলাদেশে উত্পাদন ব্যয় জাপানের তুলনায় ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ কম।”
তবে এই সমীক্ষায় উদ্বেগের কথাও আছে। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে আমদানি ছাড়পত্র পেতে গড়ে প্রায় ১৪ দশমিক ৩ দিন সময় লাগে। বিমানবন্দরে লাগে ৮ দশমিক ১ দিন। এদিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
৮১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে স্থানীয়দের নিয়োগের ক্ষেত্রে, প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ এবং অভিজ্ঞ কর্মীর ঘাটতির কথা জানিয়েছে।
কর্মীদের কাজের মান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রায় ৬১ দশমিক ৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান। গত বছর এটি ছিল ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ।
এই সমীক্ষার ভিত্তিতে জেইটিআরও বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষ করতে প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে আক্সেসরিস সংগ্রহ করতে সমস্যায় পড়েন।
গত ডিসেম্বরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ জাপানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা করছে। এক দশক আগে এ সংখ্যাটি ছিল ৮২।
জাপানের উদ্যোক্তারা ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ৩৮৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন।
জেইটিআরওর মুখপাত্র উজি আন্দো বলেন, “বাংলাদেশে মৌলিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ শেষ হবে বলে, আগামী পাঁচ বছর জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।”
কয়েক বছর ধরে টানা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে বাংলাদেশ। এ কারণে, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে বিনিয়োগ করতে উত্সাহ পাচ্ছে।
তার উপলব্ধি, “এখন ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ আরও উন্নত হচ্ছে।”

ডেইলী স্টার

ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদ পুনর্বিবেচনা হবে: অর্থমন্ত্রী

আ হ ম মুস্তফা কামাল।
আ হ ম মুস্তফা কামাল। ফাইল ছবি
ডাকঘর সঞ্চয় স্কিমের সুদহার পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সচিবালয়ে বুধবার অর্থনীতি ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নে এ আশ্বাস দেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ডাকঘরের সুদহার কমানো হয়েছে, এটি আমি দেখব। সঞ্চয়পত্রে বলা ছিল সুদহার কমাতে হলে আমাদের কম সুদে ফান্ড দিতে হবে ব্যাংকগুলোর কাছে, না হলে ব্যাংকগুলো কিভাবে কাস্টমারকে ঋণ দেবে। সে কারণে এ কাজটি আমাদের করতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি আবার রিভিজিট করব, এবার যদি না পারি পরবর্তী বাজেটে করব। দেশের গরিব মানুষ কষ্ট পাক তা চাই না।’
মন্ত্রী বলেন, এগুলো (সঞ্চয়পত্র) ফাইন্যান্সিয়াল টুল হিসেবে অর্থনীতিতে ভালো ফল দেয় না। তবে এখান থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে। আমাদের এখন মূল কাজ হচ্ছে কোথাও ছাড় দিতে হবে কোথাও কিছু পেতে হলে।’
মুস্তফা কামাল বলেন, ‘সুদহার এক অংকে নিয়ে আসা আমাদের মূল লক্ষ্য। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে তাতে হাত দিতে হবে, সঞ্চয়পত্রেও হাত দিতে হবে। সঞ্চয়পত্র করা হয়েছিল পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টাকা এখানে আসুক আমরা চাই, এজন্য এগুলোকে একটি বিধিবিধানের মাধ্যমে নিয়ে এসেছি, প্রথমে ২৫ পরে ৫০ এবং পরে যৌথ ১ কোটি টাকা করলাম। তবে আজ যেটা করলাম কাল পরিবর্তন করতে হতে পারে, এটি বাস্তবায়ন হবে ১ এপ্রিল থেকে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পোস্ট অফিসে আমরা হাত দেইনি। সবাই চলে গেছে, সেখানে বেশি সুদের আশায়। সবাই এখন একথা বলছে দেখি আমরা কিছু করতে পারি কিনা।’
ডাকঘরে গরিব ও প্রান্তিক মানুষ স্কিমগুলো নিয়ে থাকে তাদের জন্য কিছু করা হবে কিনা- এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এদের জন্য কিছু করতে হলে করব, আমাদের জানতে হবে তারা কারা, তাদের আইডেন্টিফিকেশন নম্বর দেব, যাতে বেশি কিনতে না পারে সেটি আমরা দেখব। এসব মানুষের জন্য ট্যাক্স রেট রিকনসিডার করব।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, মানুষ সুদ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করছে। পৃথিবীর কোনো দেশে এভাবে ব্যাংকে টাকা রাখলে ইন্টারেস্ট দেয়া হয় না, উল্টো টাকা দিতে হয়। যে দেশে ব্যবসা আছে, সে দেশে ব্যাংকে টাকা রাখে না। আমাদের কাছে সবাই সমান, ব্যবসায়ীদের ইফেকটিভ রেটে টাকা দিতে হবে- এটি আমাদের কমিটমেন্ট। না হলে ব্যবসা প্রসার হবে না- ছেলেমেয়েদের কর্মসংস্থান হবে না।’
১৩ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এক পরিপত্রে ডাকঘরে যে সঞ্চয় ব্যাংক রয়েছে সেই ব্যাংকের সুদহার সরকারি ব্যাংকের সুদহারের সমপর্যায়ে নিয়ে আসা হয়। সাধারণ হিসাবের ক্ষেত্রে সুদহার সাড়ে ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় বলেছে, ডাকঘরে চারভাবে টাকা রাখা যায়। ডাকঘর থেকে জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরে সঞ্চয়পত্র কেনা যায়, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে মেয়াদি হিসাব ও সাধারণ হিসাব খোলা যায়। আবার ডাক জীবন বীমাও করা যায়।
যেুগান্তর

Tuesday, February 18, 2020

আবুল মাল আবদুল মুহিত আর্থিক খাত বাঁচাতে হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে

যুগান্তর


 সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত





দীর্ঘ সময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ সময়ের সাফল্য নিয়ে তিনি যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনই ব্যর্থতা নিয়েও তার রয়েছে মর্মব্যথা। বিশেষ করে ব্যাংক ব্যবস্থায় লুটপাট আর অনিয়মে ব্যবস্থা নিতে না পারায় যথেষ্ট আক্ষেপ রয়েছে তার।
কেন পারেননি, দেশের বর্তমান আর্থিক খাত ও ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়েই বা কী করণীয়- এসব নিয়েও তার কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে। সিলেটে রোববার মুহিতের বাসায় তার সঙ্গে কথা বলেছেন যুগান্তরের সিলেট ব্যুরোর সিনিয়র রিপোর্টার মাহবুবুর রহমান রিপন।
যুগান্তর : দেশের বর্তমান অর্থনীতি কীভাবে দেখছেন?
মুহিত : অর্থনীতি তো ভালো অবস্থায় আছে এখনও। অর্থনীতির উন্নয়ন অগ্রযাত্রা হয়তো আরও দুই বছর থাকবে। কিন্তু এরপর কী হবে, সেটা বলা মুশকিল। সেটা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় যাবে এবং বিশ্বের সঙ্গে অ্যাডজাস্টমেন্ট কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তার ওপর। এখনও এসব পরীক্ষা আমাদের নতুন মন্ত্রিসভার সামনে আসেনি।
যুগান্তর : নতুন কোনো চ্যালেঞ্জ সামনে আসছে কি না?
মুহিত : অবশ্যই আছে। কেননা আন্তর্জাতিকভাবেই অবস্থান তেমন ভালো না। দেখবে, প্রজেকশন অব গ্রোথ প্রতিনিয়ত কমাচ্ছে আইএমএফ। সেগুলো চিন্তা করা প্রয়োজন। কেননা আমরা একটি উঠতি দেশ, এখানে একটু ভাটা পড়লেই বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।
যুগান্তর : এখনই ব্যবস্থা নেয়া উচিত কি না?
মুহিত : অবশ্যই নেয়া উচিত। অর্থ মন্ত্রণালয় হয়তো বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই দেখছে। কেননা বাংলাদেশ যথেষ্ট অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। সুতরাং তাদের পক্ষে বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া কঠিন হবে না।
যুগান্তর : ব্যাংকিং সেক্টরে আজকের এমন দুরবস্থা কেন হল এবং কারা দায়ী বলে মনে করেন?
মুহিত : ব্যাংকগুলো ভালো অবস্থায় নেই, সেটা সত্য। খেলাপি ঋণই বড় সমস্যা তৈরি করেছে। সেখানে কোনো ব্যবস্থা হচ্ছে বলে মনে হয় না। এটা বছরের পর বছর চলছে। খেলাপি ঋণ কমাতে এখনই উল্লেখযোগ্য পরিকল্পনা নেয়া উচিত। এ অবস্থার জন্য দায়ী আসলে আমরা সবাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোক্তা ছিল না। যারা সুবিধা নিয়েছে, তারা কখনোই উদ্যোক্তা ছিল না। তারা লুটপাট করতে এসেছিল। লুটপাট করে চলে গেছে।
আমাদের দুর্ভাগ্য- সেটা বুঝেও বারবার তাদের সুবিধা দিয়ে গেছি। এজন্য আমিও কিছুটা দায়ী। এসব ব্যাংক বন্ধ করে দেয়া উচিত ছিল আমার। আমি পারিনি। কারণ আমার ভয়ংকর রকমের ভয় ছিল। একটি ব্যাংক বন্ধ করে দিলে দেশের জন্য খুব ক্ষতিকর হতো বলে মনে হয়েছিল। নিজের একটা অভিজ্ঞতা ছিল।
১৯৪৮-৪৯ সালে কমরেড ব্যাংক দেউলিয়া হয়, ওই সময়ে আমি ছাত্র। বৃত্তির টাকা থেকে সাইকেল কেনার জন্য আমার জমানো ১৪০ টাকা আর ফেরত পাইনি। খুব কষ্ট হয়েছিল। সেই অনুভূতি থেকেই ব্যাংক বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে চাইনি। সেটা আমার ভুল ছিল। যেমন- ফারমার্স ব্যাংক প্রতিষ্ঠাই হয়েছিল চোর ব্যাংক হিসেবে। যারা চোর ছিল, তারা প্রথমেই সব নিয়ে চলে গেছে। তারা কোনোভাবেই অভিযুক্ত হয়নি, খুব চালাকি করেছে। এই ব্যাংক বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম।
এখন মনে হচ্ছে, সেটা ভুল হয়েছে। কারণ, দেশের ব্যাংকিং সেক্টর এখন এই পর্যায়ে নেই যে একটি ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলে অর্থনীতিতে ধস নামবে। এটা আসলে আমারই ভুল হয়েছে।
যুগান্তর : ব্যাংকের একশ্রেণির মালিক বা পরিচালকরাই বিপুল অঙ্কের বেনামি ঋণ তুলে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছেন? এমন অভিযোগ এখন অনেকটা প্রতিষ্ঠিত। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।
মুহিত : হ্যাঁ, সেটা হচ্ছেই। এটা বন্ধ করতে এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। খেলাপি ঋণের একটি শতাংশ যেটা হতে পারে- ৯ কিংবা ১০ শতাংশ নির্ধারণ করে দিতে হবে। এটার বেশি হলেই...। ব্যাংককে আর কোনো ব্যবসার সুযোগ দেয়া যাবে না। নিজের ব্যবসা ছাড়া অতিরিক্ত কিছু করতে দেয়া হবে না। বন্ধ হয়ে গেলেও কোনো সুবিধা নয়। এমন সিদ্ধান্ত নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
যুগান্তর : ব্যাংক মালিকরা নিজের ব্যাংকের ঋণ নেয়ার কোটা শেষ করে অন্যান্য ব্যাংক থেকে ভাগাভাগি করে ঋণ নিচ্ছেন? সম্প্রতি সংসদে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন ব্যাংক মালিকরা এভাবে পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা ঋণ তুলে নিয়েছেন। প্রশ্ন হল- তাদেরকে ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে কি এভাবে জনগণের আমানত ভাগাভাগি করে নিতে। আপনার মন্তব্য কী?
মুহিত : যারা এর জন্য দায়ী, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এসব দায়ী ব্যক্তিকে ব্যাংকের কোনো সহায়তা নয়। কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে, যাতে কোনো ব্যাংক থেকেই তারা সুবিধা না পায়। সব পথ বন্ধ করে দিতে হবে।
যুগান্তর : প্রভাবশালী ব্যাংক মালিকদের অনেকেই মোটা অঙ্কের ঋণ দফায় দফায় পুনর্গঠন করে নিচ্ছেন। ফলে খেলাপি তালিকায় তাদের নাম আসছে না। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
মুহিত : এটা যে কোনোভাবে এখনই বন্ধ করতে হবে। এটা চলতে দেয়া ভুল। এসব ব্যাংকে একইভাবে খেলাপি ঋণের ৯ অথবা ১০ শতাংশের সীমা দিতে হবে। সীমা অতিক্রম করলেই অন্য ব্যবসা বন্ধ করে শুধু নিজের ব্যাংকের ব্যবসাই চালাতে হবে।
যুগান্তর : এই সিদ্ধান্ত নিলে তো প্রায় সব ব্যাংকই বন্ধ হয়ে যাবে?
মুহিত : বন্ধ হয়ে যাক। দেশে অনেক ব্যাংক আছে। এর মধ্যে ১০, ২০ কিংবা ৩০টি ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলেও কিছু হবে না।
যুগান্তর : ব্যাংকে ঋণ অবলোপনের মতো একটি ভয়াবহ অপরাধ কীভাবে জায়গা করে নিল। এছাড়া অবলোপনের নামে এখন পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ খাতা থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই অবলোপনের মধ্যে ব্যাংক মালিকদের বেনামি ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। বিষয়টি নিয়ে হাই পাওয়ার কমিটি করে তদন্ত করা প্রয়োজন কি না?
মুহিত : ব্যাংকগুলো ঋণ অবলোপনের সুযোগ নিচ্ছে আবার বাড়তি সুবিধাও নিচ্ছে- এটা চলতে পারে না। সরকারের উচিত এখনই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঋণ অবলোপনের সুযোগ বন্ধ করা। এতদিন দেয়া হয়েছে, এখন আর নয়। অন্যদিকে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত, তা না হলে এই সুবিধা চলতে থাকলে খেলাপি ঋণেই উৎসাহিত হবে।
যুগান্তর : বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেকে এলসি ওপেন করে কোনো পণ্যই আনেননি। পুরো অর্থই বিদেশে পাচার করেছেন। এসব ঘটনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলোর প্রভাবশালী পরিচালকরা জড়িত। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত সার্ভার নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসাজশ থাকায় একশ্রেণির হাইপ্রোফাইল ব্যাংক মালিক এমন আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড অনেকদিন থেকে নির্বিঘ্নে করে আসছেন। মূলত এভাবে দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি টাকা পাচার হয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
মুহিত : প্রথমেই যারা এলসির মাধ্যমে অর্থ পাচারে জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে কালো তালিকাভুক্ত করা। তাদের নতুন করে এলসির সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দেয়া। সর্বোপরি ভালো ব্যবস্থা হবে- সবার জন্যই এ সুবিধাই বন্ধ করে দেয়া। যদিও একটু কঠিন হবে তবুও তাদের বলে দেয়া। এত বছর ধরে এই সুবিধা দিচ্ছে সরকার। এখন আর নয়। এটাই হবে উত্তম পদ্ধতি।
যুগান্তর : বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিদেশে বিনিয়োগ করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বিদেশে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, এমনকি মার্কেট কেনা থেকে শুরু করে সেকেন্ড হোমসহ নানা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। যাদের অনেকে ব্যাংকের মালিক, ব্যবসায়ী এবং সরকারের সাবেক ও বর্তমানে কর্মরত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তাদের এই টাকার উৎস্য কী এবং বিদেশে তারা কীভাবে এসব অর্থ নিয়ে গেলেন। এদের তদন্তের আওতায় এনে বিচার করার প্রয়োজন আছে কি না?
মুহিত : যারা বিদেশে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট বানাচ্ছেন- এটা সম্পূর্ণ চুরি করেই করছেন। এই টাকা যেভাবে যায় সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ। এটা কালো টাকা। বহুবার কালো টাকা দেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়েছে, কিন্তু লাভ হয়নি। যারা নেয়ার তারা এখনও নিচ্ছে। তাদের তালিকা করে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল- বিশ্বের অনেক দেশ এতে সহায়তা করবে না। তবুও একটি উদ্যোগ নেয়া উচিত, যতটুকু সহায়তা পাওয়া যায়। তাতেই অনেকে ধরা পড়বেন।
যুগান্তর : অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আপনার উল্লেখযোগ্য সফলতা কী? পাশাপাশি যদি কেউ আপনার সময়কালের বড় কোনো ব্যর্থতার কথা জানতে চায় তাহলে উত্তরটা কী হবে? বিশেষ করে আজকের ব্যাংকিং খাতে যে অরাজকতা বিরাজ করছে তার কোনো দায় কি আপনার আছে?
মুহিত : আমার উল্লেখযোগ্য সফলতা হল- এখন আর বাংলাদেশে কেউ না খেয়ে মরে না। দারিদ্র্য বিমোচন লক্ষ্য ছিল, তা একটি পর্যায়ে চলে এসেছে- এটাই বড় সফলতা। অনেক সফলতা আছে বলেই ব্যর্থতা কিছুটা কম। তবে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অরাজকতায় ব্যবস্থা না-নেয়াটা ভুল ছিল, ব্যর্থতা নয়।
প্রশ্ন : ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট দমনে কোনো আক্ষেপ কি আছে, যে আপনি বহু চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত কিছু করতে পারেননি?
মুহিত : আক্ষেপ তো থাকবেই। তবে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে সেই আক্ষেপ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট দমনে আমি কিছুই করতে পারিনি। ভেবেছিলাম, অবসরে যাওয়ার আগে একটি পরিকল্পনা দিয়ে যাব; কিন্তু সেটাও পারিনি। অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন ১০ বছরে দেশকে অর্থনৈতিকভাবে এমন একটি স্থানে নিয়ে গিয়েছিলাম- এসব লুটপাট, দুর্নীতি বন্ধ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। কারণ, যে জেনারেশন ঘুষে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, সেই জেনারেশন কোনোভাবেই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আমার পরবর্তী সময়ে যারা অর্থ মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন তাদের ওপর ছেড়ে দিয়েই অবসর নিয়েছিলাম।
যুগান্তর : রিজার্ভ চুরির তদন্ত রিপোর্ট কেন প্রকাশ করা হল না? আপনিও চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি কেন?
মুহিত : রিজার্ভ চুরির সঙ্গে হাইলেভেলের একটি প্রতিষ্ঠান জড়িত। যেমন: বড় অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। যাদের কাছে সব দেশ টাকা রাখে। সুতরাং এই স্থানে এত বড় একটি চুরি হয়েছে এটা নিয়ে সবাই চিন্তিত ও লজ্জিত। কিন্তু বাংলাদেশের অসুবিধা হচ্ছে অনেক অর্থ হারিয়ে গেল। আমার মনে হয়, এখনও বাংলাদেশের কিছু পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ আছে। যেমন: রিজাল ব্যাংকের মতো একটি ডাকাত ব্যাংক আর থাকা উচিত নয়। সারা বিশ্বে ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরি হয় বিশ্বাসের ওপর। সেই বিশ্বাস তো রিজাল ব্যাংক রাখতে পারেনি। সুতরাং এই ব্যাংকটি আর বিশ্বের কোথাও থাকতে পারে না। সেই ব্যবস্থা এখনও বাংলাদেশ করতে পারে। শুধু এটা প্রমাণ করে যে, রিজাল ব্যাংক বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, তাই এটা বন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ তা করছে না। রিজাল ব্যাংক চালাকি করে সব দায় একটি মেয়ের ওপর দিয়েছে। মূলত পুরো ব্যাংকই এ চুরির জন্য দায়ী।
যুগান্তর : রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠাই কি ব্যাংক ব্যবস্থার দুরবস্থার কারণ?
মুহিত : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিবেচনায়ও ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়; কিন্তু আমাদের দেশে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়। বেশিরভাগ মালিকই ব্যাংকার নন, কোনো অভিজ্ঞতাও নেই; কিন্তু দলের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তাই তারা পেয়েছেন। আমাদের দেশে ব্যাংক পেয়েই তারা প্রভাবশালী হয়ে যান। তাদের আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে উল্টো আরও শিথিল করা হয়। সেই কারণেই এ অবস্থা হয়েছে। সেটা ঠিক হয়নি।
যুগান্তর : এখনও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ আছে কি না?
মুহিত : অবশ্যই আছে। দেশের এখন যে অবস্থা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে কোনো সমস্যাই হবে না।
যুগান্তর : চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধেই (জুলাই-ডিসেম্বর) ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে আগে কখনও এত ঋণ সরকারকে নিতে হয়নি। এতে দেশের অর্থনীতিতে কোনো অশনিসংকেত দেখছেন কি না?
মুহিত : এটা ভালো লক্ষণ নয়। এভাবে ঋণ নিলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আরও প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে এক্সচেঞ্জ রেট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। টাকার অবমূল্যায়ন হবে। জনকল্যাণের জন্য খুব খারাপ দিক হবে।
যুগান্তর : এভাবে ঋণ নেয়ার পেছনের কারণ কী থাকতে পারে?
মুহিত : সরকারকে নিজেদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। কারণ, গত তিন বছর রাজস্ব আদায়ে ফলস স্টেটমেন্ট দেয়া হয়েছে। তাই সরকার বাধ্য হয়েছে হয়তো। রাজস্ব আদায়ের বিষয়টি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আদায় বাড়াতে যা করা প্রয়োজন তাই করতে হবে। ব্যাংক ব্যালেন্স দ্রুত কমাতে হবে।
যুগান্তর : ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে বাস্তবায়ন করতে খোদ প্রধানমন্ত্রী কয়েক দফা নির্দেশনা দেয়ার পরও বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে কারা দায়ী বলে আপনি মনে করেন?
মুহিত : ঋণের সুদের হার সরকার চাপিয়ে দিলে যেমন ঠিক থাকবে না, তেমনি বিনিয়োগকারীরা ১২ শতাংশ ঋণ নিয়ে ২০ শতাংশ মুনাফা করার পরিবেশও বাংলাদেশে নেই। নিয়মতান্ত্রিকভাবে নেমে এলে এটার সুফল পাওয়া যাবে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে নেমে আসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হলে আমানতের সুদের হার যেটা হবে সেটাই যে সর্বোৎকৃষ্ট, তা উপলব্ধি করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সারা বিশ্বেই মার্কেট পলিসি কঠিন। সিঙ্গেল ডিজিটে এলেই যে তা সঠিক হবে, তা এখনই কেউ বলতে পারবে না। তবে এটা নামানো প্রয়োজন।
যুগান্তর : রাষ্ট্রের স্বশাসিত সংস্থাগুলোর স্থিতিতে থাকা ২ লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি টাকা উন্নয়নের কাজে লাগানোর পরিকল্পনায় আইন করা হয়েছে, এটা কীভাবে দেখছেন?
মুহিত : এই কাজটি ভালো করেছে। কারণ, সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হবে অন্যদিকে সরকারের ক্ষতি হবে, সেটা তো হয় না।
যুগান্তর : কখনও ক্ষুব্ধ হলে নেতিবাচক অর্থে আপনি প্রায়ই ‘রাবিশ’ শব্দটি ব্যবহার করতেন। রাবিশ যদি কোনো ব্যক্তি হয়, তাহলে ব্যাংকিংসহ পুরো অর্থনীতি সেক্টরে এই ‘রাবিশ’দের সংখ্যা কত শতাংশ?
মুহিত : না, এখানে এই শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এর জন্য আমরাও (সরকার) দায়ী। আমরা তো শুধু ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসাহ দিয়েছি, অনেক সুবিধা দিয়েছি। নয় বছর পর্যন্ত পরিচালক থাকতে পারবেন ইত্যাদি। লালনপালন অনেক করেছি। কিন্তু যাকে লালনপালন করা হয়, অন্যায় করলে তাকে শাস্তিও দিতে হয়। সেই কাজটি করতে পারিনি। এটাই আমাদের দুর্ভাগ্য। শাস্তি দেয়ার বিষয়টি আদৌ ঘটবে কি না, তা আমি জানি না। এটা আমাদের সিস্টেমের ভুল।

Sunday, February 16, 2020

Workshop on INCOTERMs 2020; Clear Understanding and Applications


ফরেন ট্রেড এর সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন বানিজ্যিক ব্যাংকের নির্বাহী/কর্মকর্তাগণদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ন Workshop হয়ে গেলো গত ১৪ ও ১৫ই ফেব্রয়ারী, ২০২০ সালে স্থানীয় একটি হোটেলে। দুদিনের এই কর্মশালায় বিভিন্ন বানিজ্যিক ব্যাংকের প্রায় ২০০ জন নির্বাহী/কর্মকর্তাগণ অংশগ্রহন করেন । International Chamber of Commerce (ICC) কর্তৃক INCOTERMs 2020 বিভিন্ন Rules নিয়ে আলোচনা করা হয় কর্মশালায়। মালয়েশিয়ার TRADE QUEST MANAGEMENT SDN BHD ও BLACKSTONE INSTITUTE বাংলাদেশ যৌথভাবে এই workshop আয়োজন করেন।

দুদিনের এই কর্মশালায় স্পীকার হিসাবে উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষক মোহাম্মদ ইমরান। DOMESTIC এবং INTERNATIONAL TRADE TERMS বিষয়ে খুব সহজ সরলভাব উপস্থাপন করা হয়। Trade based money laundering & Financing of Terrorism এর মাধ্যমে ফরেন ট্রেড এর ক্ষেত্রে বিভিন্ন ঝুঁকির বিষয়ে বিশদ চিত্র তুলে ধরা হয়। Case to Case এর মাধ্যমে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে গুরুত্বপূর্ন দুটি বিষয়ের উপর এই কর্মশালা এর সাথে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী/কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের সহায়ক হিসাবে কাজ করবে- এটি নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
বিভিন্ন ব্যাংকের নির্বাহী/কর্মকর্তাদের একই প্লাটফরমে উপস্থিত হয়ে পরস্পরের মাঝে পেশাগত বিষয়গুলো আদান প্রদানের একটি সুযোগ তৈরি হলো। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের কর্মশালা বেশী বেশী হওয়া প্রয়োজন বলে অংশগ্রহনকারীর অনেকেরই অভিমত।
যদিও প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব Training Institute বিষয়ের উপর ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা হয় । বিভিন্ন ব্যাংকের নির্বাহী/কর্মকর্তাগণদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠার সুযোগ থাকে না। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ফরেন ট্রেড এর বিষয়গুলো শেয়ার করার সুযোগ কম হয়ে থাকে।
এই কর্মশালার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে একটি প্লাটফরম তৈরি হয়েছে।
এই কর্মশালায় INCOTERMs 2010 সংশোধন করে INCOTERMs 2020 এর মাধ্যমে রপ্তানীকারক এবং আমদানিকারকদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্য তুলে ধরা হয়।
অংশগ্রহণকারীদের বোঝার সুবিধার্থে রঙিন টেকিনিক এবং ডায়াগ্রাম ব্যবহার করা হয়।
Seller এবং Buyer এর obligation সমূহ তুলে ধরা হয়।
কীভাবে INCOTERMs 2020 বীমা কভারেজের সাথে সম্পর্কিত?
INCOTERMs 2০০০(১৩টি), INCOTERMs 2010(১১টি) এবং
INCOTERMs 2020( ১১টি) তুলনা করা হয়।
The impact of INCOTERMs 2020 to the banker when issue a Letter of Credit. এবং
Mod of Transportation INCOTERMs 2020 সহ
আমাদনীকারক ও রপ্তানীকারক এর Risk কভারেজ, দায়িত্ব ও Freight Charges বিষয়ে সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়।

Trade based money laundering & Financing of Terrorism কি এবং International dimension কিভাবে সংঘটিত হয় এবং এটি কমিয়ে নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জসমূহ উপস্থাপন করা হয়।
Case Study মাধ্যমে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়। How trade Products can be used for Money Laundering ?
Laws against Money Laundering বিষয়ে বিশদ তুলে ধরা হয় যা অংশগ্রহকারীগণ অর্জিত শিক্ষা কর্মক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারবেন সহজেই। কর্মশালার শেষে অংশগ্রহনকারী নির্বাহী/কর্মকর্তাগণের মধ্যে The London Institute of Banking & Finance কর্তৃক সার্টিফিকেট প্রদান করা হয় । এটিও ক্যারিয়ারের সুফল বয়ে নিয়ে আসার সুযোগ।
উল্লেখ্য ইতিপূর্বে এই দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে আরো কর্মশালার আয়োজন করেছিলো। ফরেন ট্রেড এ কর্মরত বানিজ্যিক ব্যাংকের নির্বাহী/কর্মকর্তাদের এই কর্মশালা আরো আয়োজনের মাধ্যমে ব্যানিজ্যিক ব্যাংকের ঝুঁকি কমে আসবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

মোঃ মোবারক হোসেন
সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার
জনতা ব্যাংক, লোকাল অফিস, ঢাকা।